"Comply মানলেই Comply, না মানলেই Explain": হাস্যরসাত্মক ব্যাখ্যা
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি আসলে কী, কেন এটি নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সহজ রাস্তা নয়, এবং ভালো ও খারাপ "এক্সপ্লেইন" এর মধ্যে ফারাক কোথায়, হাস্যরসাত্মক উপমায় বোঝা।
Md. Mehedi Hasan, LLB, ACS
04 October 2026 · 4 min read · 6 views
In This Article
স্কুলজীবনে হোমওয়ার্ক না করে আসা একজন ছাত্রের কথা মনে করুন। শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলে দুই রকম উত্তর হতে পারে। প্রথমজন বলে, "স্যার ভুলে গেছি," যা কোনো প্রকৃত ব্যাখ্যা নয়। দ্বিতীয়জন বলে, "স্যার, গতকাল রাতে আমার ছোট ভাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, আমি সারারাত সেখানে ছিলাম, আজ বিকেলের মধ্যে জমা দিচ্ছি।" দুজনেই হোমওয়ার্ক করেনি, কিন্তু দ্বিতীয়জনের ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য এবং একটি সমাধানের পথ দেখায়। কর্পোরেট গভর্নেন্সের "কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন" নীতিও ঠিক এই নীতিতেই দাঁড়িয়ে, নিয়ম না মানলে চলবে, কিন্তু তার জন্য একজন ছাত্রের মতো দায়সারা উত্তর নয়, সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি কী
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন একটি নিয়ন্ত্রক পদ্ধতি, যেখানে কোম্পানিকে একটি কোডের নির্দেশনা মানতে বলা হয়, কিন্তু না মানলে সরাসরি শাস্তির পরিবর্তে কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়। এই পদ্ধতির ধারণা মূলত যুক্তরাজ্যের ১৯৯২ সালের ক্যাডবারি কমিটির প্রতিবেদন থেকে জনপ্রিয় হয়, যা পরে বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ ও এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে।
বাংলাদেশে এই নীতি বাস্তবে কীভাবে কাজ করে
কোড-২০১৮ এর শেষে একটি অ্যানেক্সার-সি চেকলিস্ট আছে, যেখানে মোট ১৬৬টি লাইন আইটেম আছে। প্রতিটি তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তালিকা ধরে ধরে জানাতে হয়, কোন শর্ত পরিপালিত হয়েছে এবং কোনটি হয়নি, না হলে তার কারণ কী। এরপর একজন স্বতন্ত্র পেশাদার হিসাবরক্ষক বা সনদধারী সেক্রেটারি একটি সার্টিফিকেট দেন, যা নিশ্চিত করে এই ঘোষণা সত্য। অর্থাৎ এখানে কোনো নিঃশব্দ উপায়ে নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, প্রতিটি অপরিপালিত শর্ত প্রকাশ্যেই থেকে যায়।
A quick story
একটি মাঝারি আকারের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে একটি শর্তের বিপরীতে লিখেছিল, "আমরা এই শর্ত মানিনি, কারণ এটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বলে মনে হয়েছে।" এটি কোনো প্রকৃত ব্যাখ্যা নয়, বরং দায়সারা একটি বাক্য। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী পর্যালোচনায় এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং কোম্পানিকে নতুন করে সুনির্দিষ্ট কারণ, সময়সীমা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উল্লেখ করে পুনরায় ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়।
অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠান একই রকম একটি শর্ত না মানার কারণ হিসেবে লিখেছিল, একজন উপযুক্ত স্বাধীন পরিচালক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না নির্দিষ্ট পেশাগত যোগ্যতার কারণে, নমিনেশন কমিটি তিনজন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং আগামী প্রান্তিকের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা আছে। এই ব্যাখ্যা নির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য এবং একটি সময়সীমাসহ সমাধানের পথ দেখায়, যা একটি গ্রহণযোগ্য "এক্সপ্লেইন"-এর উদাহরণ।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, "ব্যাখ্যা দেওয়া" এবং "ব্যাখ্যা দেওয়ার ভান করা"-র মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
প্রকৃত ব্যাখ্যায় থাকে সুনির্দিষ্ট কারণ, একটি সময়সীমা এবং ভবিষ্যতে সমাধানের পরিকল্পনা। ভানের ব্যাখ্যায় থাকে অস্পষ্ট, সাধারণীকৃত বাক্য, যা পড়ে কেউই বুঝতে পারে না আসলে কী ঘটেছে বা কখন সমাধান হবে।
| Category | Step |
|---|---|
| শর্ত ধরে ধরে পর্যালোচনা | 1 |
| পরিপালন/অ-পরিপালন চিহ্নিতকরণ | 2 |
| সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা লেখা | 3 |
| স্বতন্ত্র পেশাদারের সনদ | 4 |
কেন এই নীতিকে "নিয়ম এড়ানোর লাইসেন্স" ভাবা ভুল
অনেকে ভুলভাবে মনে করেন "এক্সপ্লেইন" অপশন থাকার মানে হলো ইচ্ছামতো শর্ত এড়িয়ে যাওয়া যায়। বাস্তবে প্রতিটি অপরিপালিত শর্ত প্রকাশ্যে বার্ষিক প্রতিবেদনে থেকে যায়, যা বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সাংবাদিকরা সহজেই দেখতে পান। একটি প্রতিষ্ঠান যত বেশি শর্ত "এক্সপ্লেইন" করে, তত বেশি বাজারের নজরদারির মুখে পড়ে। এই সামাজিক ও বাজারভিত্তিক চাপই আসলে নীতিটিকে কার্যকর রাখে, আইনি জরিমানার চেয়েও এই প্রকাশ্য জবাবদিহিতা অনেক সময় বেশি প্রভাবশালী।
Common Mistakes Companies Make
-
1
অস্পষ্ট, সাধারণীকৃত ভাষায় ব্যাখ্যা লেখা
"প্রযোজ্য নয়" বা "প্রক্রিয়াধীন" এর মতো বাক্য কোনো প্রকৃত তথ্য দেয় না এবং যাচাই করা অসম্ভব।
-
2
ব্যাখ্যায় কোনো সময়সীমা উল্লেখ না করা
সময়সীমা ছাড়া ব্যাখ্যা বছরের পর বছর একই অবস্থায় স্থির থেকে যেতে পারে, কোনো অগ্রগতি ছাড়াই।
-
3
একই শর্ত বারবার একই ব্যাখ্যায় অ-পরিপালিত রাখা
একবার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হলেও তা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকলে প্রকৃত সমাধানের ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
-
4
অ্যানেক্সার-সি কে নিয়মরক্ষার কাগজ মনে করা
এটি নিছক কাগজপত্র নয়, বরং একটি স্বচ্ছতার হাতিয়ার, যা গুরুত্ব না দিলে পুরো উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
বাস্তব কেস স্টাডি
Case Study
একটি দুর্বল ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যাত হওয়া
Scenario: একটি কোম্পানি চেয়ারম্যান ও এমডি পদ আলাদা না রাখার শর্ত না মানার কারণ হিসেবে লিখেছিল, "প্রতিষ্ঠাতার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে।"
Problem: এই ব্যাখ্যায় কোনো সময়সীমা বা পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছিল না, এবং এটি বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থেকে যায়।
Solution: নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনার পর কোম্পানি একটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তর পরিকল্পনা জমা দেয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদ দুটি আলাদা করার প্রতিশ্রুতি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বাড়তি তদারকির ব্যবস্থা উল্লেখ ছিল।
Case Study
গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার একটি উদাহরণ
Scenario: একটি ছোট তালিকাভুক্ত কোম্পানি একজন পদত্যাগী স্বাধীন পরিচালকের শূন্য আসন এক মাসের মধ্যে পূরণ করতে পারেনি।
Problem: কোডের নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্য আসন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করা বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছিল না।
Solution: কোম্পানি তার বার্ষিক প্রতিবেদনে নমিনেশন কমিটির অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, ইতিমধ্যে সাক্ষাৎকার নেওয়া প্রার্থীর সংখ্যা এবং নির্দিষ্ট পরবর্তী প্রান্তিকের মধ্যে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেয়।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার প্রতিষ্ঠানের গত বার্ষিক প্রতিবেদনের "এক্সপ্লেইন" অংশগুলো যদি অন্য কেউ পড়ে, তারা কি আসলে বুঝতে পারবেন কী ঘটেছে?
নিজের লেখা ব্যাখ্যাগুলো একবার বাইরের চোখে পড়ে দেখা ভালো অভ্যাস, কারণ প্রায়শই লেখক নিজে যা স্পষ্ট মনে করেন, পাঠকের কাছে তা অস্পষ্ট থেকে যায়।
উপসংহার
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি আসলে নিয়ম না মানার লাইসেন্স নয়, বরং এটি একটি পরিণত, বাস্তবসম্মত জবাবদিহিতার ব্যবস্থা, যা স্বীকার করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন এবং প্রতিটি শর্ত সবসময় সবার জন্য একভাবে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এই ছাড়ের বিনিময়ে যা চাওয়া হয়, তা হলো সততা এবং সুনির্দিষ্টতা। "রাবার স্ট্যাম্প বোর্ড" নিয়ে আমাদের লেখায় একই রকম একটি দায়সারা সংস্কৃতির আলোচনা আছে। কর্পোরেট গভর্নেন্স কী তা নিয়ে আরও পড়তে চাইলে আমাদের গভর্নেন্স বিভাগে ঘুরে আসতে পারেন।
FAQ
কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি প্রথম কোথায় চালু হয়?
এই ধারণা মূলত যুক্তরাজ্যের ১৯৯২ সালের ক্যাডবারি কমিটির প্রতিবেদন থেকে জনপ্রিয় হয়, পরে বিশ্বজুড়ে অনেক দেশের গভর্নেন্স কোডে গৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশে এই নীতি কোথায় প্রযোজ্য?
বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ এর অ্যানেক্সার-সি চেকলিস্টের মাধ্যমে, যেখানে ১৬৬টি শর্ত ধরে ধরে পরিপালন ঘোষণা দিতে হয়।
একটি কোম্পানি কি সব শর্ত "এক্সপ্লেইন" করে এড়িয়ে যেতে পারে?
আইনগতভাবে পারে, কিন্তু প্রতিটি ব্যাখ্যা প্রকাশ্য থাকে এবং অতিরিক্ত "এক্সপ্লেইন" বাজারের আস্থা নষ্ট করে, তাই এটি কোনো সহজ পথ নয়।
গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যায় কী থাকা উচিত?
সুনির্দিষ্ট কারণ, একটি স্পষ্ট সময়সীমা এবং ভবিষ্যতে সমাধানের পরিকল্পনা।
কে এই ঘোষণা যাচাই করে সনদ দেন?
একজন স্বতন্ত্র পেশাদার হিসাবরক্ষক বা সনদধারী সেক্রেটারি প্রতি বছর এই ঘোষণা যাচাই করে একটি সার্টিফিকেট দেন।
একই শর্ত বছরের পর বছর না মানলে কী হয়?
নিয়ন্ত্রক সংস্থা অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা সতর্কীকরণ পাঠাতে পারে, এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি একটি নেতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়।
অ্যানেক্সার-সি তে কতগুলো শর্ত আছে?
মোট ১৬৬টি লাইন আইটেম আছে, যা কোডের সবগুলো কন্ডিশনের উপ-ধারা কভার করে।
ছোট কোম্পানির জন্য কি আলাদা ব্যাখ্যার মান শিথিল?
কোড নিজে আকার অনুযায়ী আলাদা ছাড় দেয় না, তবে ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপটে কোম্পানির আকার ও সম্পদ একটি স্বাভাবিক বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা কীভাবে এই ব্যাখ্যাগুলো ব্যবহার করেন?
বার্ষিক প্রতিবেদনের অ্যানেক্সার-সি অংশ পড়ে তারা বুঝতে পারেন কোম্পানির গভর্নেন্স অনুশীলন কতটা পরিণত এবং দুর্বলতাগুলো কোথায়।
Key Points
- ●কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতি নিয়ম এড়ানোর লাইসেন্স নয়, বরং একটি জবাবদিহিতামূলক বিকল্প পথ।
- ●এই ধারণা যুক্তরাজ্যের ক্যাডবারি কমিটির প্রতিবেদন থেকে উদ্ভূত এবং বিশ্বব্যাপী গৃহীত।
- ●বাংলাদেশে অ্যানেক্সার-সি এর ১৬৬টি শর্তের মাধ্যমে এই নীতি কার্যকর হয়।
- ●গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যায় সুনির্দিষ্ট কারণ, সময়সীমা এবং সমাধানের পরিকল্পনা থাকতে হয়।
- ●অস্পষ্ট বা পুনরাবৃত্ত ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নেতিবাচক সংকেত।
- ●প্রকাশ্য ঘোষণা ও স্বতন্ত্র সনদায়নের কারণে এই নীতিতে নিয়ম এড়ানোর কোনো নিঃশব্দ উপায় নেই।