কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ এর কন্ডিশন ১ অনুযায়ী বোর্ডের আকার, স্বাধীন পরিচালকের সংখ্যা, চেয়ারম্যান ও এমডি পদ আলাদা রাখার নিয়ম এবং পরিচালকদের প্রতিবেদনের বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ এর প্রথম এবং সবচেয়ে দীর্ঘ কন্ডিশনটি একাই পুরো কোডের অ্যানেক্সার-সি চেকলিস্টের ৬৯টি লাইন আইটেমের উৎস, যা আমরা কোডের সম্পূর্ণ গাইডে চার্টে দেখিয়েছি। এই কন্ডিশনটি নির্ধারণ করে একটি বোর্ড কেমন হবে, কতজন থাকবেন, তাদের মধ্যে কতজন স্বাধীন হবেন এবং চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীর পদ কীভাবে আলাদা থাকবে।
Ad space (reserved)
বোর্ডের আকার, সর্বনিম্ন ৫, সর্বোচ্চ ২০
কন্ডিশন ১(১) অনুযায়ী একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোর্ডে সদস্য সংখ্যা ৫ জনের কম বা ২০ জনের বেশি হতে পারবে না। এই সীমা দুই দিক থেকেই যুক্তিপূর্ণ, খুব ছোট বোর্ডে পর্যাপ্ত বৈচিত্র্য ও দক্ষতা থাকে না, আর খুব বড় বোর্ডে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর ও অকার্যকর হয়ে পড়ে।
স্বাধীন পরিচালক, কমপক্ষে এক-পঞ্চমাংশ
কন্ডিশন ১(২) অনুযায়ী বোর্ডের অন্তত এক-পঞ্চমাংশ (১/৫) সদস্য স্বাধীন পরিচালক হতে হবে, এবং কোনো ভগ্নাংশ এলে তা পূর্ণসংখ্যায় উন্নীত করতে হয়। অর্থাৎ হিসাব করার সময় সবসময় ওপরের দিকে রাউন্ড করতে হয়, নিচের দিকে নয়। স্বাধীন পরিচালকের বিস্তারিত সংজ্ঞা, যোগ্যতা ও মেয়াদকাল নিয়ে আমরা আলাদাভাবে লিখেছি স্বাধীন পরিচালক কে এবং কেন প্রয়োজন তার ওপর, এখানে শুধু সংখ্যার হিসাবটি দেখে নেওয়া যাক।
বোর্ডের আকার অনুযায়ী ন্যূনতম স্বাধীন পরিচালক সংখ্যা (১/৫ অংশ, পূর্ণসংখ্যায় উন্নীত)
Category
Value
৫ জনের বোর্ড
1
১০ জনের বোর্ড
2
১৫ জনের বোর্ড
3
২০ জনের বোর্ড
4
A quick story
ধরা যাক একটি কোম্পানির বোর্ডে ৭ জন সদস্য আছেন। ৭ এর এক-পঞ্চমাংশ হলো ১.৪, এবং নিয়ম অনুযায়ী এই ভগ্নাংশকে পূর্ণসংখ্যায় উন্নীত করতে হবে, তাই তাদের অন্তত ২ জন স্বাধীন পরিচালক রাখতে হবে, ১ জন নয়। অনেক ছোট কোম্পানিই প্রথমবার এই হিসাব করার সময় ভুল করে নিচের দিকে রাউন্ড করে ফেলে, যা পরে কমপ্লায়েন্স রিপোর্টে "Not Complied" হিসেবে ধরা পড়ে।
চেয়ারম্যান ও এমডি বা সিইও, একই ব্যক্তি হতে পারবেন না
কন্ডিশন ১(৪) অনুযায়ী বোর্ডের চেয়ারপারসন এবং এমডি বা সিইও এর পদ দুইজন ভিন্ন ব্যক্তিকে দিতে হবে। চেয়ারপারসনকে অবশ্যই বোর্ডের নন-এক্সিকিউটিভ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করতে হবে, এবং বোর্ডকে স্পষ্টভাবে দুজনের দায়িত্ব আলাদা করে লিখে রাখতে হবে। নিয়মিত চেয়ারপারসন অনুপস্থিত থাকলে অন্য একজন নন-এক্সিকিউটিভ সদস্যকে সেই নির্দিষ্ট সভার জন্য চেয়ারপারসন নির্বাচন করা যায়, তবে কারণ মিনিটসে উল্লেখ করতে হয়।
আপনি কি জানেন, কেন একজন ব্যক্তি একসাথে চেয়ারম্যান এবং সিইও হতে পারেন না?
কারণ সিইও হলেন ব্যবস্থাপনার প্রধান, যার কাজ বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করা। যদি একই ব্যক্তি চেয়ারম্যান হিসেবে বোর্ডের সভা পরিচালনা করেন এবং সিইও হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন নিজেই তদারকি করেন, তাহলে স্বাধীন তদারকির পুরো ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুই পদ আলাদা রাখাই বোর্ডের স্বাধীন তদারকি সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রথম পদক্ষেপ।
Ad space (reserved)
পরিচালকদের প্রতিবেদনে কী কী থাকতে হয়
কন্ডিশন ১(৫) এ কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এর অধীনে প্রস্তুত করা পরিচালকদের প্রতিবেদনে ২৭টি অতিরিক্ত তথ্য বা বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া আছে। এর মধ্যে আছে শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, সেগমেন্টভিত্তিক কার্যক্রমের বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ও উদ্বেগের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে লেনদেনের বিস্তারিত তালিকা, আর্থিক প্রতিবেদন সত্য ও স্বচ্ছভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এমন ঘোষণা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর আছে এমন বিবৃতি এবং বিগত পাঁচ বছরের মূল আর্থিক তথ্যের সারসংক্ষেপ। এছাড়াও বোর্ড সভার সংখ্যা, প্রতিটি পরিচালকের উপস্থিতি এবং শেয়ারহোল্ডিং প্যাটার্নের বিস্তারিত তথ্যও এখানে প্রকাশ করতে হয়।
এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমডি/সিইও এবং সিএফওর নিজ স্বাক্ষরে একটি ঘোষণা, যেখানে তারা নিশ্চিত করেন আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য নেই। এই ঘোষণার খুঁটিনাটি এবং সিএফও ও কোম্পানি সেক্রেটারির অন্যান্য দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত পাবেন আমাদের আলাদা লেখায়।
বোর্ড সভা ও আচরণবিধি
কন্ডিশন ১(৬) অনুযায়ী বোর্ড সভা পরিচালনা এবং মিনিটস সংরক্ষণ করতে হয় ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (ICSB) এর প্রণীত বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়াল স্ট্যান্ডার্ডস অনুসরণ করে। আর কন্ডিশন ১(৭) অনুযায়ী বোর্ডকে এনআরসির সুপারিশের ভিত্তিতে চেয়ারপারসন, অন্য বোর্ড সদস্য এবং সিইও এর জন্য একটি আচরণবিধি তৈরি করতে হয়, যা কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হয়।
আপনার যদি কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন পড়ার সময় মনে হয় তথ্য অনেক বেশি, তাহলে এখন বুঝতে পারছেন কেন?
কারণ একাই কন্ডিশন ১ এর ২৭ দফা নির্দেশনা মানতে গিয়ে প্রতিবেদনের আকার অনেক বড় হয়ে যায়। এই বিস্তারিত তথ্য আসলে বিনিয়োগকারীদের জন্যই, যাতে তারা শুধু মুনাফার সংখ্যা নয়, পুরো কোম্পানির ঝুঁকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও ধারণা পান।